
ঝিনাইদহের শৈলকুপার ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদের দান-অনুদানসহ বিভিন্ন খাতের অর্থের হিসাব নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। মসজিদের মোতাওয়াল্লি মীর শামসুজ্জামান পান্নার বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকার বেশি অর্থের হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মুসল্লি ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, গত দুই বছরের বেশি সময়ে মসজিদের বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ৬১ লাখ টাকা আয় হলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি মসজিদের ইমামের কাছ থেকেও মাসিক চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাদশা হোসেন শাহ ওয়াক্ফ স্টেটের অধীনে পরিচালিত শৈলকুপা শাহী মসজিদে প্রতিদিন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা দান-অনুদান দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মসজিদের জন্য অনুদান আসে। কিন্তু এসব অর্থের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে পরিচালনা কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে কমিটির সদস্যরাও মসজিদের আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জানতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মসজিদের মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব পান মীর শামসুজ্জামান পান্না। এরপর থেকে গত দুই বছরের বেশি সময়ে দান-অনুদানসহ বিভিন্ন খাত থেকে মোট ৬১ লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। এর অর্ধেক অর্থ মসজিদের খাদেমের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানানো হয়। বাকি অর্ধেক অর্থ মোতাওয়াল্লির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে জমা হওয়া অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় মুসল্লি ও স্কুলশিক্ষক জাহিদ হোসেন বলেন, “মসজিদের প্রতিদিনের আয়ের অর্ধেক টাকা মোতাওয়াল্লির কাছে জমা হয়। সেই টাকা ব্যাংকে জমা রাখার কথা থাকলেও তিনি কোনো ব্যাংকে জমা রাখেননি। এমনকি ওই অর্থের কোনো হিসাবও দেননি। সম্প্রতি মসজিদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানেও তিনি কোনো টাকা দেননি। গাছ বিক্রি ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।”
মসজিদ কমিটির আরেক সদস্য হোসেন আলী বলেন, “দুই বছর ধরে মসজিদে কোনো সভা হয় না। টাকা-পয়সা কোথায়, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তারও কোনো হিসাব নেই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুসল্লি অভিযোগ করে বলেন, “দুই বছরের বেশি সময়ে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা মোতাওয়াল্লির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের অভিযোগ, পুরো অর্থই আত্মসাৎ করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে শৈলকুপা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শিহাব মল্লিক বলেন, “মসজিদের অর্থের অনিয়ম কোনোভাবেই কাম্য নয়। গত দুই বছরে সংগৃহীত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোতাওয়াল্লি মীর শামসুজ্জামান পান্না। তিনি বলেন, “এত টাকা কোথায়? দুই-তিন লাখ টাকা থাকতে পারে। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
এ বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, “মসজিদের অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় মুসল্লিদের দাবি, শৈলকুপা শাহী মসজিদের গত দুই বছরের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, ব্যাংক হিসাব যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হোক। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।