
ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার এক সময় রাজ পথের পরিচিত মুখ ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। দলীয় আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছিল সরব উপস্থিতি। হরিণাকুণ্ডু থানার মাঠ কাঁপানো সেই সাবেক যুবদল নেতা আব্দুর রাজ্জাক এখন সময়ের ব্যবধানে অনেকটাই আড়ালে। এক সময় যাঁর নেতৃত্বে মুখরিত হতো রাজনৈতিক অঙ্গন, আজ তাঁর জীবনে নেমে এসেছে অসহায়ত্ব। জীবনের কঠিন সময়ে পাশে নেই বলে অভিযোগ তাঁর অনুসারীদের। এমনকি দলের অনেক নেতাকর্মীও তাঁর খোঁজ খবর রাখেন না বলে জানা গেছে।
আব্দুর রাজ্জাক হরিনাকুন্ডু পৌরসভার আদর্শ পাড়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। বর্তমানে তিনি শারীরিক ভাবে চরম অসুস্থতার মধ্যে আছেন। বর্তমানে ঔষুধ বা সংসার চালানোর কোন পরিস্থিতি নাই তার।
তিনি ৯০ দশকের দিকে হরিণাকুণ্ডু যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আব্দুর রাজ্জাক হরিণাকুন্ডু উপজেলা শ্রমিক দলের যুগ্ম সম্পাদক পদে আছেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তৎকালীন সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা, সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। আব্দুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক অঙ্গনে যাঁর উপস্থিতি ছিল আলোচিত, বর্তমানে সেই মানুষটির জীবন কাটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলায় দলের জন্য সময় ও শ্রম দেওয়ার পরও দুঃসময়ে সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হরিনাকুন্ডু বাশি অনেকে মনে করেন, রাজনীতিতে একজন কর্মীর অবদান শুধু সুসময়ের উপস্থিতি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দলের কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের দুঃসময়ে খোঁজখবর নেওয়া রাজনৈতিক ও মানবিক দায়িত্বের অংশ।
প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা একজন সাবেক প্রতিষ্ঠাতা নেতার বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা কী? যাঁর নেতৃত্বে একসময় রাজনৈতিক মাঠ সরগরম থাকত, তাঁর দুঃসময়ে কেন দেখা যাচ্ছে না সেই পরিচিত মুখগুলো?
রাজনীতি শুধু ক্ষমতা, পদ-পদবি কিংবা মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ত্যাগ, শ্রম, ভালোবাসা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। আব্দুর রাজ্জাকের বর্তমান পরিস্থিতি সেই মানবিক দায়িত্ববোধ নিয়েই নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
দলীয় নেতাদের কাছে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাবেক এই নেতার খোঁজখবর নেওয়া হোক এবং তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হোক। রাজপথের পরিচিত মুখ, আজ নিজের দুঃসময়ে কতটা একা আব্দুর রাজ্জাক এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে হরিণাকুণ্ডুর রাজনৈতিক অঙ্গনে।
আব্দুর রাজ্জাকের জানান, বিএনপি দলের জন্য অনেক শ্রম দিয়েছি। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। দলের দুঃসময়ে রাজপথে থেকেছি, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু আজ নিজের জীবনের কঠিন সময়ে এসে অনেকটাই একা হয়ে পড়েছি।
বর্তমানে আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। নানা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। একসময় যাঁদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি, যাঁদের জন্য সময় ও শ্রম দিয়েছি, তাঁদের অনেককেই এখন আর পাশে পাই না। কেউ খোঁজখবরও নেন না। জীবনের এই সময়ে খুব বেশি কিছু চাই না, শুধু চাই দলের পুরোনো সহকর্মীরা একটু খোঁজ নিক, পাশে দাঁড়াক। দলের জন্য আমার ত্যাগ ও অবদানটুকু যেন সবাই মনে রাখে।
হরিণাকুণ্ডু পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, আব্দুর রাজ্জাক একসময় হরিণাকুণ্ডুর রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন। যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলের জন্য অনেক শ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি ছোটবেলায় দেখেছি আব্দুর রাজ্জাক বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিংয়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। একসময় তাঁর নেতৃত্বে হরিণাকুণ্ডুর রাজনৈতিক মাঠ সরগরম থাকত। অথচ আজ সেই মানুষটি অসহায় জীবনযাপন করছেন। তাঁর এই দুর্দিনে দলীয় নেতাকর্মীদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। যাঁরা দলের জন্য অতীতে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের ভুলে গেলে চলবে না। আব্দুর রাজ্জাকের বর্তমান অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া, তাঁর অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দলীয়ভাবে জরুরি। আমরা চাই, দলের পুরোনো ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেন অবহেলিত না থাকেন।
হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান মাস্টার বলেন, আব্দুর রাজ্জাক দলের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন। দলের দুঃসময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর খোঁজখবর রাখি এবং তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছি। একসময় দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই মানুষটি বর্তমানে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। দলের জন্য তাঁর ত্যাগ ও অবদান কখনোই ভুলে যাওয়ার নয়। আমি মনে করি, দলের পক্ষ থেকে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা কর্মীদের সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই নেতার জন্য দলের উপর মহল তার পাশে থেকে সহযোগিতা করবেন বলে তিনি মনে করেন।