শিরোনাম :
বাঘারপাড়ায় নদীর তীর ঘিরে চলাচলে সংকট, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি শৈলকুপায় সামাজিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, নারীসহ আহত ৭ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি থেকে শ্যামলী সূত্রধরকে অব্যাহতি। সারা দেশের মত আজ হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গাপূজার দশমী সিলেটে ও সম্পন্ন। শ্রীমঙ্গলে শান্তিপূর্ণভাবে বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন মাগুরায় যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ, মহাসড়ক অবরোধ বেলাবোতে বিএনপির সভাপতি লাল মিয়ার ৮টি পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে, আসাদুজ্জামান ইউপি নির্বাচনে মুনাফেকি করলে দলে তাদের কোনো জায়গা হবে না: আইনমন্ত্রী ঝিনাইদহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৩০ বাড়িঘর ও দোকান ভাংচুরের অভিযোগ

ঝিনাইদহে কৃষকের ঘরে বীজ নেই, বাড়ছে বাজার নির্ভরতা

মোঃ রবিউল ইসলাম রবি , নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪০ সময়-দৃশ্য

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষক

ঝিনাইদহে কৃষকদের অনেকের ঘরেই এখন আগের মতো সংরক্ষিত বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নতুন মৌসুমে ফসল উৎপাদনের জন্য বাজার থেকে বীজ কিনতেই হচ্ছে তাদের। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে মানসম্মত বীজ পাওয়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের প্রবণতা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়ছে বাজার নির্ভরতা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় বিভিন্ন ফসলের ভালো ফলন দেওয়া বীজ আলাদা করে রেখে পরবর্তী মৌসুমে ব্যবহার করতেন তারা। এতে বীজ কেনার খরচ কমার পাশাপাশি নিজেদের পছন্দের জাত ধরে রাখার সুযোগ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চর্চা কমে গেছে। এখন অনেক কৃষকই স্থানীয় বাজার, বীজের দোকান কিংবা বিভিন্ন সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে বীজের দাম প্রতিবছর বাড়ছে। পাশাপাশি একই নামে বিভিন্ন মানের বীজ পাওয়া যায়। ভালো বীজের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ফসলের শুরুতেই আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে হয় কৃষককে।

কৃষকরা বলছেন, বীজের ক্ষেত্রে বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বীজের বাড়তি খরচ বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে মানসম্মত বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হলে বাজারনির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।

তাদের মতে, কৃষকের হাতে ভালো বীজ থাকা মানে শুধু উৎপাদন খরচ কমানো নয়; বরং ফসল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাই কৃষকের ঘরে বীজ সংরক্ষণের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে,ঝিনাইদহ জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। বাকি বড় একটি অংশ পূরণ করছে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো। একসময় ঝিনাইদহের কৃষকদের বড় একটি অংশ নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকেই পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণ করতেন। প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজস্ব বীজ ব্যবহার করতেন। বর্তমানে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ কৃষক কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনে ব্যবহার করছেন। ফলে ধীরে ধীরে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের ঐতিহ্য কমে গিয়ে বাজারনির্ভরতা বাড়ছে। জেলায় বীজের বাজারে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানির প্রভাবও রয়েছে। লাল তীর, এসিআই,বায়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির বীজ কৃষকদের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফলে কৃষকের বীজের চাহিদার একটি বড় অংশ এখন বেসরকারি খাত থেকে পূরণ হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী,ঝিনাইদহে একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি জাত,ডালের ২২ থেকে ২৫টি জাত এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ ছিল। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি,ডালের জাত ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনেক জাতের বীজ সংরক্ষণ ও চাষ কমে যাওয়ায় সেগুলোর অস্তিত্ব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে বিএডিসির বীজ জেলার মোট কৃষকের প্রায় ২০ শতাংশের চাহিদা পূরণ করতে পারে। ফলে বীজের বাকি চাহিদা পূরণে কৃষকদের একটি বড় অংশকে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণের প্রবণতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন,কৃষকের বীজ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগও রয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব প্রকল্প,পার্টনার প্রোগ্রাম এবং তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির মতো প্রকল্প রয়েছে। তারা বলছেন, বিভিন্ন প্রদর্শনী প্লটে ভিত্তি বীজ ও প্রত্যয়িত বীজ ব্যবহার করা হয়। পরে সেই বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলের বীজ কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সুযোগ থাকে।

শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তার অভিযোগ,কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। তখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক সেই সুবিধার বাইরে থাকছেন। এ অবস্থায় কৃষকের ঘরের বীজ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন শুধু ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি কৃষির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা,কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া,স্থানীয় জাত সংরক্ষণ করা এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ কৃষকের ঘরে বীজ থাকা মানে শুধু পরের বছরের চাষের নিশ্চয়তা নয়। এটি দুর্যোগের দিনে কৃষকের হাতে বিকল্প,সংকটের দিনে কৃষির হাতে নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের খাদ্য ব্যবস্থার হাতে একটি শক্ত ভিত।

কৃষককের অভিযোগ, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজের আধিপত্য বাড়লেও মান নিয়ন্ত্রণ ও কৃষক সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোম্পানির বীজ কিনে প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেক কৃষকের। কারও অভিযোগ,বীজের অঙ্কুরোদগম কম; কারও অভিযোগ,প্যাকেটে যে জাতের কথা বলা হয়েছে,মাঠে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। অথচ বীজ নষ্ট হলে শুধু বীজের দামই নয়, কৃষকের পুরো মৌসুমের শ্রম,সার,কীটনাশক ও সেচের খরচও ঝুঁকিতে পড়ে।

শৈলকুপার ধাউড়া গ্রামের কৃষক দুলাল হোস বলেন,’আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।’

মনোহরপুর গ্রামের কৃষক মফিজ হোসেন বলেন,’বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক,সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।’

কালীগঞ্জের আরেক কৃষক এনমুল হক বলেন,নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষকরা লাভবান হয়। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না৷ বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।’

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন,কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন,কৃষকেরা যাতে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেন,সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। সেখান থেকে ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কামরুজ্জামান আরও বলেন,’বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না,সেটি ভালোভাবে শুকানো,রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।

Halal Soap ,H.S.S. Road, Jhenaidah

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যটাগরির আরও খবর
© All rights reserved ©2026 realkhabor.com